Monday - 25 - May - 2020

করোনা ও তেল বাণিজ্যের প্রভাব সারাবিশ্বে

Published by: সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক |    Posted: 2 months ago|    Updated: 2 months ago

An Images

সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক :

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে (কভিড-১৯) বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার প্রভাব এখন স্পষ্ট। বিগত অর্থনৈতিক মন্দার মতো শেয়ারবাজারে ধস দিয়েই এর শুরু হলো। এবার মন্দার সঙ্গে বাড়তি যোগ হলো সৌদি-রাশিয়ার তেলের ‘দাম যুদ্ধ’। বিশ্ববাজারে তেলের দর ২০ ডলারে নেমে আসারও আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। পরিস্থিতি এমন হলে অর্ধেক মার্কিন তেল কোম্পানির দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। তেল উত্তোলন খরচ বেশি হওয়ায় রাশিয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হবে মার্কিন কোম্পানিগুলো। এমনিতেই কয়েক মাস ধরে করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের চাহিদা কমে গেছে।

এদিকে গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ দরপতনের পর মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও গতকাল বুধবার আবারও বড়ো দরপতন হয়েছে। বাজার খুলতে না খুলতেই বিভিন্ন সূচক ৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। সকালে লেনদেন শুরুই হয় নিম্নমুখী ধারায়। কিছুক্ষণের মধ্যে নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান মূল্যসূচক ডাওজোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল এভারেজ ইনডেক্স প্রায় ১০১৫ পয়েন্ট বা ৪ দশমিক ১ শতাংশ কমে যায়। এ সময়ে শীর্ষ মূলধন সম্পন্ন ৫০০ কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত মূল্যসূচক এসঅ্যান্ডপি ৫০০ পয়েন্ট বা ৩ দশমিক ৭ শতাংশ কমে। অন্যদিকে প্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলোর সূচক নাসদাক কম্পোজিট কমে ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ। এই দরপতনের জন্য বিশ্লেষকরা বলছেন, সৌদি আরব-রাশিয়ার তেলযুদ্ধ এবং করোনা ভাইরাসজনিত ভীতির প্রভাব পড়েছে বাজারে। এই দুটি বিষয়ের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা নেমে আসতে পারে।

করোনার কারণে চীন থেকে প্রতিদিন ১ কোটি ব্যারেল তেলের চাহিদা কমে গেছে। তবে তেলের দাম কমার ফলে প্রকৃতভাবে কারা লাভবান হবে সেটি এখনই বলা মুশকিল। তেল কোম্পানিগুলো বাজারে শেয়ারের দর হারাতে শুরু করেছে। রাশিয়া বলছে, দাম কমে যাওয়ায় তাদের অর্থনীতিতে তেমন প্রভাব পড়বে না। কারণ, ব্যারেলপ্রতি ৪০ ডলার ধরে বাজেট পরিকল্পনা করে তারা। কিন্তু কম মূল্যে দীর্ঘদিন তেল বিক্রি হলে যুক্তরাষ্ট্র যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তেমনি রাশিয়াতেও এর নেতিবাচক প্রভাব হবে মারাত্মক। গত সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ৩০ ডলারের নিচে নেমে যায়, যা গত ত্রিশ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে এমন দাম কমেছিল ১৯৯১ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়। গত দুই দিনে দর কিছুটা বাড়লেও ৩৫-৩৬ ডলারেই সীমাবদ্ধ ছিল ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দর।

সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, বিশ্বের অন্যতম তেল উত্পাদনকারী দেশ সৌদি আরব তেলের ‘দাম যুদ্ধ’ শুরু করায় বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সারাবিশ্বে তেলের চাহিদা কমে গেছে। বাজারে দামের ভারসাম্য রাখতে ওপেক তেল উত্তোলন কমানোর সিদ্ধান্ত নিলেও রাশিয়া এতে একমত নয়। ফলে রাশিয়াকে শায়েস্তা করতে সৌদি আরব তেল উত্তোলন বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। উপসাগরীয় দেশ সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনীতি তেলনির্ভর। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব দেশের সরকারি ব্যয় অনেক বেশি। তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম অন্তত ৭০ ডলার হওয়া প্রয়োজন। তাছাড়া তেলের দর কমলে ইরাক, ইরান, লিবিয়া ও ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিও বিপাকে পড়বে।

এদিকে মন্দার ফলে অর্থনীতির ক্ষতিকর প্রভাব মূল্যায়ন করতে শুরু করেছে বড়ো দেশগুলো। এরই মধ্যে বিনিয়োগ বাড়াতে কেন্দ্রীয়ভাবে সুদহার কমানোর ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেকেই। গতকাল যুক্তরাজ্যে সুদহার কমানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে মন্দার শঙ্কা ঘিরে ধরেছে অস্ট্রেলিয়াকে। চলমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ১৯৯১ সালের পর অস্ট্রেলিয়া প্রথম মন্দায় পড়তে যাচ্ছে বলে ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে। গত সপ্তাহে সুদহার কমিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে ক্ষতি মোকাবিলায় সরকার ৬৬০ কোটি ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ গ্রহণ করতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

ব্যাংক অব ইংল্যান্ড গতকাল জরুরিভাবে সুদহার শূন্য দশমিক ৭৫ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ করেছে। ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে এখন তাদের সুদহার। অর্থনীতির ক্ষতি কাটাতে ব্যাংকগুলো বিলিয়ন ডলার সহযোগিতা দেবে বলেও তারা জানিয়েছে। শিগিগরই এ ধরনের আরো ঘোষণা আসছে। এর আগে ২০০৮ সালে বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা শুরু হলে ‘বেইল আউট’ বা পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে সময় লাগলেও এবার বেশ আগেভাগেই সতর্ক হয়ে পড়েছে দেশগুলো।

গত সোমবার শেয়ারবাজারে বড়ো ধস হলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বড়ো সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। গত ৩ মার্চ মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ জরুরিভাবে সুদহার দশমিক ৫ শতাংশ কমিয়েছে। একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও ইন্দোনেশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো। তবে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতির যে সংশয় সেটি এই সুদহার হ্রাসের মাধ্যমে কতটা কাটবে সেটা অনিশ্চিত। করোনা ভাইরাস মূলত অর্থনীতির উত্পাদন ব্যবস্থার গোড়াতেই আঘাত হেনেছে। সরবরাহ চেইন, শ্রম, পণ্য উত্পাদন, সেবা খাত ইত্যাদি সবকিছুই এর দ্বারা আক্রান্ত।